সাক্ষাৎকার

সাফল্যের গল্প – এবার আমাদের সাথে আছেন ডিজিটাল মার্কেটার সোহেল পারভেজ

সাফল্যের গল্প

মোহাম্মদ সোহেল পারভেজ, দেশের অন্যতম সেরা ডিজিটাল মার্কেটার। আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর দীর্ঘ দিনের এই পথচলায় তিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্ক সহ কাজ করেছেন অনেক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে, অর্জন করেছেন গুগল অ্যাডওয়ার্ডস এবং গুগল অ্যানালিটিক্স সার্টিফিকেশন।কাজ করছেন এবং করেছেন দেশ বিদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাক্তির সাথে। বর্তমানে দেশের অন্যতম তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল হাব লিমিটেডের হেড অব ট্রেনিং হিসেবে কর্মরত আছেন ।  বিশ্বের অন্যতম ই-কমার্স সাইট অ্যামাজন সহ অনেক মার্কেট প্লেসে অ্যাফিলিয়েট  মার্কেটার হিসেবে কাজ করছেন সাফল্যের সাথে।এছাড়া তিনি সরকারের বিভিন্ন আইটি বিষয়ক প্রজেক্টেও কাজ করেন।  ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের নানা বিষয় নিয়ে তিনি টেকনোবার্তার মুখোমুখি হন।

উঠে আসার গল্প – এবার আমাদের সাথে আছেন ডিজিটাল মার্কেটার সোহেল পারভেজ

 

টেকনোবার্তাঃ ডিজিটাল মার্কেটিং কি?

সোহেল পারভেজঃ বর্তমান সময়ে ডিজিটাল মার্কেটিং কে বলা যায় একটি কোম্পানি, কোম্পানির পণ্য বা সেবার প্রচার ও প্রসারের জন্য অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এর প্রধান কারণ – যুগের চাহিদা। বর্তমান যুগ ডিজিটাল যুগ। আপনি এখন যে পৃথিবীতে বাস করছেন তার সর্বত্র ছড়িয়ে আছে ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়া। সাধারন মানুষ, বিশেষ করে আমাদের ইয়াং জেনারেশন এর কাছে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন কমিউনিকেশন ও শেয়ারিং ইত্যাদির জনপ্রিয়তা দ্রুত গতিতে বাড়ছে।ডিজিটাল মার্কেটিং মূলত একটি তথ্যভিত্তিক আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বিক্রেতারা তাদের নির্দিষ্ট পণ্য নিয়ে সরাসরি সঠিক ভোক্তার নিকট পৌঁছাতে পারেন। যেমন ধরুন, আমরা যখন ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সাইন আপ করি, তখন আমাদেরকে নাম, জন্ম তারিখ, অবস্থান, আমি কী করছি ইত্যাদি বিষয়গুলো ফেসবুককে সরবরাহ করতে হয়। এই তথ্যগুলোর উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপনদাতারা ফেসবুক ব্যবহারকারীদের টার্গেট করে থাকেন। এছাড়া প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো খোঁজ করছি গুগল কিংবা অন্য কোন সার্চ ইঞ্জিনে। সার্চ ইঞ্জিনগুলো আমাদের চাহিদার উপড় ভিত্তি করে তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি আমাদের তাদের বিজ্ঞাপনগুলো দেখাচ্ছে। সহজ কথায়, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে খুব সহজেই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে বিক্রেতারা তাদের বিজ্ঞাপন বা তথ্য ভোক্তার নিকট পৌঁছে দিতে পারেন এবং ভোক্তারাও তাদের চাহিদা মাফিক তথ্য পেয়ে উপকৃত হন। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে কাজ করার বিভিন্ন ধরনের মাধ্যম রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় মাধ্যমগুলো হল- সোশ্যাল মিডিয়া, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং/কন্টেন্ট মার্কেটিং, ই-মেইল মার্কেটিং, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, ভিডিও মার্কেটিং এবং সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটিং।

টেকনোবার্তাঃ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে কারা ভালো করতে পারে?

সোহেল পারভেজঃ আমি মনে করি, যারা কোন কিছু নিয়ে বিশ্লেষণ বা গবেষণা করতে পছন্দ করে, তাদেরই উচিত ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে কাজ করা। ডিজিটাল মার্কেটিং মূলত ডাটাভিত্তিক একটি আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা। যাদের আসলে ডাটা নিয়ে বিশ্লেষণ করার ইচ্ছা ও দক্ষতা আছে, সেই সাথে মার্কেটিংয়ের জ্ঞান আছে, পাশাপাশি মার্কেটিং নিয়ে পড়তে ভাল লাগে- তারা এ পেশায় ভাল করবে। সেই সাথে মানুষের সাইক্লোজি বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা যাদের আছে অথবা যারা এটা করতে পছন্দ করেন তারাও এ পেশায় ভাল করতে পারবে বলে আমার ধারণা।

টেকনোবার্তাঃআপনি কেন এটাকে আপনার পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন? 

সোহেল পারভেজঃ  লেখাপড়ার পাশাপাশি এরকম গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী কাজ করে যদি কিছু আয় করা যায় তাহলে মন্দ হয় না ভেবেই এদিকে ঝুঁকে পড়ি। তখন ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করে এর বিষদ খোঁজ পাই ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের। প্রথমেই এ সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশুনা করে নেই। এখানে তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণের পাশাপাশি মানুষের সাইক্লোজি নিয়ে গবেষণা করার মাধ্যমে ইন্টারনেটভিত্তিক আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার যে চিত্র ফুটে উঠে, সেটি আমি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করি। ধীরে ধীরে কাজ করতে করতে এখন এটা পেশায় পরিণত হয়েছে।

টেকনোবার্তাঃ বর্তমানে পেশা হিসাবে এটা কতটুকু সম্ভাবনাময়?

সোহেল পারভেজঃ সম্প্রতি বাংলাদেশে অনেক ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি গড়ে উঠেছে, যেখানে কাজের অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের তথ্যানুসারে, ‘২০১৪ সালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনের পিছনে তাদের মোট রাজস্ব আয়ের ১০.২০% ব্যয় করেছে। এর এক-তৃতীয়াংশ ছিল ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছিলো ১৬.১% এবং ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে ১০ থেকে ১১% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০১৬ এবং ২০১৭ তে যা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক বেশি । ২০১৮ সালে যা মার্কেটারদের পছন্দের শীর্ষে থাকবে।’

সাফল্যের গল্প

 

টেকনোবার্তাঃ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে কি কি সুবিধা ও অসুবিধা আছে? 

সোহেল পারভেজঃ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সুবিধা বলতে গেলে আসলে বলতে হবে এটি সহজভাবে, কম খরচে এবং ক্রেতার চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতাকে মাথায় রেখে বিক্রেতার টার্গেট অনুযায়ী বিক্রেতা এবং ক্রেতার মাঝে মেলবন্ধন তৈরি করা। এতে করে ক্রেতাও সন্তুষ্ট হন তার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পেয়ে, অপর পক্ষে বিক্রেতাও কম খরচে তার পণ্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে পেরে আনন্দিত হন। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের অসুবিধাগুলোকে আমি অসুবিধা না বলে আসলে চ্যালেঞ্জ বলতে চাই। ইন্টারনেট যেহেতু এখনও পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছায়নি, সেহেতু ডিজিটাল মার্কেটিং চ্যানেল ব্যবহার করে তাদের কাছে পৌঁছানো অসম্ভব। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে চ্যালেঞ্জ কমতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

টেকনোবার্তাঃএখানে কি খন্ডকালিন কাজের সুযোগ আছে?

সোহেল পারভেজঃ এখানে পূর্ণকালীন এবং খন্ডকালীন উভয়ভাবেই কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। খন্ডকালীন কাজের জন্য ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোতে কাজের সন্ধান করা যেতে পারে অথবা বিভিন্ন স্থানীয় ডিজিটাল এজেন্সিতেও খন্ডকালীন কাজ করার সুযোগ আছে। আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করার ক্ষেত্রে আপনাকে ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য অবশ্যই ইংরেজীতে দক্ষ হতে হবে। এছাড়াও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের আরো কিছু আয়ের উৎস আছে। যেমন- গুগল অ্যাডসেন্স, অনলাইন বিজ্ঞাপন, ই-কমার্স পণ্য সেল, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ইত্যাদি।

টেকনোবার্তাঃ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়ের উপর জোর দেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
সোহেল পারভেজঃ আসলে ডিজিটাল মার্কেটিং একটি বিশদ বিষয় যেখানে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমি মনে করি যে কোন একটি চ্যানেল নিয়ে স্পেশালিস্ট হওয়াটা ক্যারিয়ারের জন্য ভালো। আপনি যত বেশি ফোকাস হবেন তত দ্রুত আপনার সফলতা আসবে। বিশেষ করে ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্লগে ঢুকে অনেক তথ্য পেতে পারেন। ডিজিটাল মার্কেটিং শেখার ক্ষেত্রে আপনি চাইলে এখানে ক্লিক করুন  ভিজিট করতে পারেন, ফেসবুক মার্কেটিং এর জন্য ক্লিক করুন   অনুসরণ করতে পারেন এবং গুগল অ্যাডওয়ার্ডস নিয়ে পড়াশোনা করতে  ক্লিক করুন ।এগুলো ছাড়াও আপনি চাইলে গুগলে সার্চ করলে অনেক ভাল ভাল তথ্য বহুল ব্লগ পাবেন। এছাড়াও ইউটিউবে অনেক ভিডিও রয়েছে যেগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করা যেতে পারে। অনেকেই বলে থাকেন কোথা থেকে শুরু করব? এ প্রশ্নের জবাবে আমি বলতে চাই প্রতিদিনই ডিজিটাল মার্কেটিং কিছু কিছু বিষয় নিয়ে পড়তে থাকেন, দেখবেন একদিন আপনি দক্ষ হয়ে উঠবেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রতিদিন কিছু সময় রাখি এ বিষয়ে পড়াশোনা করার জন্য। এছাড়াও বর্তমানে দেশে কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ইচ্ছে করলে সেখান থেকে কিছুটা ধারণা নিয়ে নিতে পারেন। প্রশিক্ষণ দেয়া ক্ষেত্রে কিছু অসাধুচক্র চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুনদের প্রতারিত করছে, সেগুলো থেকে অবশ্যই সাবধান থাকতে হবে।

 টেকনোবার্তাঃএই পেশায় মাসে কত আয় করা যায়?
সোহেল পারভেজঃ ডিজিটাল মার্কেটিংসহ এই ধরনের সকল কাজের আয় রোজগার নির্ভর করে নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং কাজের উপর। তবে ডিজিটাল এজেন্সিতে যারা এক্সিকিউটিভ হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে, তাদের গড়ে বিশ হাজার থেকে পঁচিশ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। আর ফ্রিল্যান্সার হিসেবে যারা কাজ শুরু করে,তারা ৩০০ থেকে ৪০০ ডলার আয় করতে পারে। তবে যারা এই ব্যাপারে দক্ষ তারা মাসিক ডিজিটাল মার্কেটিং  বা এফিলিয়েট মার্কেটিং করে একহাজার থেকে দশহাজার ডলার ও অনেকে  আয় করে। তবে পেশা হিসেবে এ ক্যারিয়ার এ আসতে চাইলে অবশ্যই প্রায়োগিক দক্ষতা থাকা আবশ্যক। সেক্ষেত্রে নতুনদের জন্য বিভিন্ন ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সিতে ইন্টার্নিশীপের জন্য যোগাযোগ করা উচিত। যেটি কিনা তাদের প্রায়োগিক দক্ষতা বাড়াবে বলে আমার বিশ্বাস।

টেকনোবার্তাঃ এই সেক্টরে নবীনদের জন্য আপনার পরামর্শ
সোহেল পারভেজঃ আমার দৃষ্টিতে যারা এই সেক্টরে কাজ করতে চায় এবং এখানে তাদের ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাদের নিয়মিত কিছু কাজ করতে হবে। সেগুলো হলো- প্রতিনিয়ত ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে পড়াশোনা করা, কারণ ডিজিটাল মার্কেটিং চ্যানেলগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হওয়া। নির্দিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে গবেষণা করা, ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কিত ব্লগ পড়ার অভ্যাস গড়া, এই বিষয়ে ব্লগে লেখালেখি করা, বিভিন্ন মার্কেটিং সামিটে যাওয়া শুধু আপনার জ্ঞান বিকশিত করবে না বরং ইন্ডাস্ট্রির লোকজনের সাথে যোগাযোগ সৃষ্টি করে দিবে। যেহেতু ডিজিটাল মার্কেটিং পুরোটাই ডাটাভিত্তিক একটি বিপণন ব্যবস্থা, এখানে ডাটা নিয়ে কাজ করতে হয় এবং আমি মনে করি ডাটা নিয়ে বিশ্লেষণ করার দক্ষতা অর্জন করার ব্যাপারে নবীনদের জোড় দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ডাটা বিশ্লেষণের জন্য যে সফটওয়ারগুলো রয়েছে, যেমন গুগল অ্যানালিটিক্স অথবা অন্য যে কোন অ্যানালিটিক্স প্লাটফর্ম নিয়ে ঘাটাঘাটি করা এবং প্রথম প্রথম ছোট ছোট ডাটা নিয়ে বিশ্লেষণ করা। সময়ের সাথে সাথে বড় বড় ডাটা নিয়ে বিশ্লেষণ করা। এই কাজগুলো নিয়মিত করলে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে উজ্জ্বল ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব।