মাইক্রোসফটের পাওয়ার পয়েন্টে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর পেটেন্ট
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের পাওয়ার পয়েন্টে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশির পেটেন্ট। ২০১৯ সাল থেকে এটি মাইক্রোসফটের সব পাওয়ার পয়েন্ট সফটওয়্যারে যুক্ত করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বাচনভঙ্গি, শব্দ প্রক্ষেপণ এবং ভাব লেনদেনে কম্পিউটার সাহায্য করবে এমন বিষয় নিয়ে সাজানো হয়েছে পেটেন্টটি। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. এহসান হক ২০১৫ সালের পিএইচডি গবেষণা প্রকাশের পর সেটি পেটেন্ট হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫০ কোটি ব্যবহারকারী পাওয়ার পয়েন্টে তার পেটেন্টটি ব্যবহার করতে পারবেন।
পাওয়ার পয়েন্টে পেটেন্ট যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে এহসান হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১০ সালে যখন এই প্রকল্প নিয়ে ভাবছিলাম, সবার তখন ভাবখানা ছিল এমন–পাগল নাকি! বক্তৃতা কীভাবে দেবো, কথা কীভাবে বলবো তা নাকি কম্পিউটারের কাছ থেকে শিখতে হবে!’
এ গবেষণার জন্য কয়েক জায়গায় তহবিলের জন্য আবেদন করলেও নিরাশ হতে হয়েছে এহসান হককে। তার কথায়, ‘প্রায় ১০ বছর সময় লাগলেও আমাদের এই প্রকল্প এখন কোটি কোটি মানুষের কাজে লাগবে এবং আরও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হবে, এটাই বড় প্রাপ্তি।’
পাওয়ার পয়েন্টে যুক্ত হওয়া পেটেন্টটির মালিকানা কার জানতে চাইলে এহসান হক জানান, এটি দাখিল করেছিল এমআইটি মিডিয়া ল্যাব। এর পৃষ্ঠপোষক হতে হলে যেকোনও প্রতিষ্ঠানকে বিশাল অঙ্কের ফি দিতে হয়। এর পরিবর্তে মিডিয়া ল্যাবের সব পেটেন্ট বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারে। ফলে এখন মাইক্রোসফট বিনামূল্যেই পেটেন্টটি ব্যবহার করতে পারছে।
এহসান হক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব রসেস্টারের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ইউনিভার্সিটি অব মেম্ফিস থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
এমআইটি ল্যাবে ২০০৮ সাল থেকে মানুষের মুখাবয়ব ও কণ্ঠ বিশ্লেষণ বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন এহসান হক। পরবর্তী সময়ে ওয়াল্ট ডিজনির গবেষণাগারে এমন এক স্বয়ংক্রিয় রোবট নিয়ে কাজ করেন যা দেখতে, শুনতে ও নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ধারাবাহিক কাজের অংশ হিসেবে ২০১০ সালে আইবিএমের গবেষণাগারে বুদ্ধিমান বিজ্ঞাপন যন্ত্র তৈরি করেন তিনি; যা পথচারীদের গতিবিধি, বয়স, কাপড়ের রঙ ইত্যাদি বুঝে বিজ্ঞাপন করতে পারে!
প্রখ্যাত বিজ্ঞানভিত্তিক ম্যাগাজিন সায়েন্স নিউজের দৃষ্টিতে ৪০ বছরের নিচে সেরা ১০ তরুণ গবেষকের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিলেন এহসান হক। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় এমআইটি জার্নাল টেকনোলজি রিভিউ ঘোষিত ৩৫ বছরের কম বয়সী সেরা ৩৫ জন উদ্ভাবকের সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি। ‘টিআর ৩৫’ নামের সেই তালিকায় স্থান পাওয়া এই তরুণ গত বছর মধ্য ক্যারিয়ারে থাকা ৪০ বছরের নিচে কাজ করা সফল ১০ তরুণ গবেষকের কাতারেও ছিলেন।
‘এসএন ১০’ নামের এই তালিকায় মূলত সেইসব তরুণ গবেষকের নাম যুক্ত করা হয়েছে, যারা ইতোমধ্যে গবেষণা ও নতুন উদ্ভাবনে সফলতা পেয়েছেন এবং ভবিষ্যতের দারুণ সব গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিতে পারেন। তালিকাটি তৈরির ক্ষেত্রে যুক্ত ছিলেন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ও ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের নির্বাচিত সদস্যরা।
কৃতিস্বত্ব বা পেটেন্ট হলো সরকার কর্তৃক একজন উদ্ভাবককে এক ধরনের অধিকার প্রদানের অনুমোদনপত্র, যে অধিকারবলে অন্য কোনও পক্ষ (সাধারণত সীমিত সময়ের জন্য) তার উদ্ভাবনের প্রস্তুতি, ব্যবহার বা বিক্রয় করতে পারে না। উদ্ভাবনটি হতে পারে যেকোনও পণ্য বা হতে পারে এমন কোনও পদ্ধতি যা মানুষের কাজে আসে। একটি কৃতিস্বত্বের মাধ্যমে এর মালিক বা উদ্ভাবক তার উদ্ভাবনের জন্য সুরক্ষা লাভ করেন।










